
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
সংস্থাটির মতে, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এসব দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, রফতানি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে শক্তিশালী করছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
আইএমএফের মঙ্গলবার প্রকাশিত সর্বশেষ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। গত জুলাইয়ে প্রকাশিত পূর্বাভাসের তুলনায় এই হার শূন্য দশমিক ৬ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। একই সঙ্গে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত আসিয়ান-৫ জোটের সম্মিলিত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়ানো হয়েছে।
ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন চলাকালে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়ল
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। গত জুলাইয়ে সংস্থাটি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল ৩ শতাংশ। তবে ২০২৭ সালের জন্য পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত বিরোধের চাপ থাকা সত্ত্বেও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বিশ্ব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশার তুলনায় ভালো অবস্থানে ছিল। এ কারণেই চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়ানো হয়েছে।
বিশেষ করে এআইসহ উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি বিশ্ব অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব বিনিয়োগের ফলে প্রযুক্তিপণ্য ও সংশ্লিষ্ট উপকরণের চাহিদা বাড়ছে। পাশাপাশি উচ্চপ্রযুক্তি খাতে শক্তিশালী অবস্থান থাকা দেশগুলোর রফতানিও বাড়ছে।
ভারতের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস
আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে ভারত বিশ্বের দ্রুততম প্রবৃদ্ধির প্রধান অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে পারে। দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭ শতাংশে উন্নীত করার পেছনে অভ্যন্তরীণ চাহিদার স্থিতিশীলতা এবং সেবা খাতের শক্তিশালী অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
ভারতের অর্থনীতিতে সেবা খাতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসায়িক সেবা, আর্থিক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন খাতে দেশটির সক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগব্যয় ও বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন করছে।
বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, সফটওয়্যার, ডিজিটাল সেবা ও সংশ্লিষ্ট খাতে চাহিদা বাড়ছে। ভারতের মতো প্রযুক্তিসেবা খাতে শক্তিশালী অবস্থান থাকা দেশগুলো এর সুফল পেতে পারে।
আসিয়ান-৫ দেশের প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি- ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের সম্মিলিত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২০২৬ সালের জন্য ৪ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ করেছে আইএমএফ।
এই উন্নত পূর্বাভাসের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ডেটা সেন্টার নির্মাণ ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
এআই ব্যবস্থার বিপুল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য ডেটা সেন্টার অপরিহার্য। এসব স্থাপনা নির্মাণে সার্ভার, চিপ, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা, শীতলীকরণ প্রযুক্তি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো প্রয়োজন হয়। ফলে ডেটা সেন্টারকেন্দ্রিক বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শিল্প, প্রযুক্তি ও সেবা খাতে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করছে।
আইএমএফের মতে, বিশ্ব প্রযুক্তি খাতের ঊর্ধ্বমুখী চক্র এসব দেশের অর্থনীতিকে বাড়তি গতি দিচ্ছে। উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত দেশগুলোতে পণ্য ও সেবার চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি রফতানির সুযোগও সম্প্রসারিত হচ্ছে।
চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাল আইএমএফ
এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের ক্ষেত্রে অবশ্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৬ সালে চীনের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। গত জুলাইয়ের পূর্বাভাসের তুলনায় এটি শূন্য দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। ২০২৫ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল ৫ শতাংশ।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। যেসব দেশের অর্থনীতি বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত নয় এবং যারা জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারা বাড়তি ব্যয়, প্রকৃত আয় কমে যাওয়া এবং সরকারি ব্যয় পরিচালনায় সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ছে।
বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এ পরিস্থিতিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আইএমএফের আশঙ্কা, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধাক্কাগুলো বিভিন্ন দেশের মধ্যে এবং একই দেশের অভ্যন্তরে আয়বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ
জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে ২০২৬ সালে বিশ্বব্যাপী সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ।
২০২৭ সালে মূল্যস্ফীতি আবার কমে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কিংবা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমাতে সরকারের নেওয়া সহায়তা কর্মসূচি সাময়িক, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কম বিঘ্ন সৃষ্টিকারী হওয়া উচিত বলে মনে করে আইএমএফ। একই সঙ্গে এসব কর্মসূচির কারণে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
তবে এআই ও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে সমর্থন দিলেও এর সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। ভারত ও আসিয়ান-৫ দেশের মতো অর্থনীতিগুলো প্রযুক্তি বিনিয়োগ থেকে বাড়তি সুবিধা পেলেও জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য মূল্যস্ফীতি, ব্যয় বৃদ্ধি এবং আয়বৈষম্যের ঝুঁকি আরও তীব্র হতে পারে।
সূত্র: নিক্কেই এশিয়া